শেয়ার করুন
প্রিয় সুধী!
আখলাকুন শব্দটি আরবী ‘খুলুকুন’ শব্দের বহুবচন। এর অর্থ স্বভাব, চরিত্র ও শিষ্টতা। মানুষের বাহ্যিক আকার-আকৃতির ক্ষেত্রে যেমন খালকুন শব্দ ব্যবহৃত হয়, ঠিক তেমনি তার অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য ও গুণাবলীর জন্য খুলুকুন শব্দটি প্রযুক্ত হয় থাকে। যেহেতু চরিত্র বলতে সাধারণত মানুষের একটি চরিত্রকে বোঝানো হয় না বরং তার জীবনের সকল চারিত্রিক দিক কে বোঝানো হয়,যেহেতু আরবী ভাষায় শব্দটির একবচনে খুলুকুন এর চেয়ে বহুবচনে আখলাকুন শব্দটিই বেশী ব্যবহৃত হয়। আখলাক মানুষের সেই স্বভাব ও মজ্জাগত বিষয়কে বলা হয় যা প্রত্যেক মানুষের মাঝে বিদ্যমান। কারো মধ্যে বেশি, কারো মধ্যে কম। আর একটু খুলে বললে এভাবে বলা যায় যে উত্তম চরিত্র হচ্ছে অপরের প্রতি ক্ষমা ও মার্জনা, উদারতা ,দানশীলতা, ধৈর্য ও সহ্য, দয়া ও মমতা, ভালবাসা ও সৌহার্দ্য, বিনয়-নম্রতা, অন্যের প্রয়োজন মেটানোর মনোবৃত্তি ইত্যাদি গুণে গুণান্বিত হওয়া।
বিশ্বে শান্তি ও শৃঙ্খলার কেবল তখনই প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারে যখন সমাজ হবে সুন্দর ও মনোরম। আর সমাজকে ভালো করতে হলে ভালো আচার-ব্যবহারের তালিম দেওয়া অপরিহার্য। একারণেই সকল ধর্মের বুনিয়াদে স্থাপিত হয়েছে উত্তম চরিত্রের উপর। প্রত্যেক যুগে প্রতেক নবী ও রাসূল এরই দিকে মানুষকে আহবান করেছেন। সর্বশেষ নবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর আবির্ভাব এর একটি মুখ্য উদ্দেশ্য ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন-انما بعثت لاتمم مكارم الاخلاق
চরিত্রের সকল সদ্গুণ কে পূর্ণতা দান করার জন্য আমি প্রেরিত হয়েছি।
মহান আল্লাহ তাকে সারা বিশ্বের চরিত্র শিক্ষা দাতাদের মাঝে বিশেষভাবে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছিলেন। উত্তম চরিত্রের এক মহান আদর্শরূপে এবং অতিথিদের জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন তিনি। এর প্রত্যয়ন এ এরশাদ হয়েছে-وانك لعلى خلق عظيم
নিঃসন্দেহে আপনি খুলুকে আজিম তথা মহান চরিত্রে অধিষ্ঠিত।
উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা রাযিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা কে আয়াতে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন-و كان خلقه القران
কুরআনী হল-রাসূল (সাঃ) এর চরিত্র বা সীরাত। অর্থাৎ কোরআন মাজিদের যেসকল উত্তম চরিত্র ও মহান নৈতিকতার উল্লেখ রয়েছে সে সবই তার মধ্যে বিদ্যমান ছিল। কোরআনে বর্ণিত চরিত্র অপেক্ষা মহত্তর চরিত্র আর কি হতে পারে? তিনি ছিলেন কোরানি চরিত্র মালার জীবন্ত প্রতিক। তিনি বহু হাদিসে উত্তম চরিত্র অবলম্বনের জন্য উৎসাহিত করেছেন এবং তার মাহাত্ম্য সম্পর্কে অবহিত করেছেন।
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-وان ابغضكم الي وابعدكم مني في الآخرة مساوءكم اخلاقا
তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আমার নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় এবং আখেরাতে আমার নিকট হতে থাকবে সবচেয়ে দূরবর্তী যে অসচ্চরিত্র।
অন্য এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
انكم لا تسعون الناس باموالكم ولكن يسعهم منكم بسط الوجه وحسن الخلق
তোমরা অর্থ সম্পদ দ্বারা মানুষকে খুশি করতে পারবে না, বরং তাদের খুশি করতে সক্ষম হবে সহাস্য চেহারা এবং উত্তম চরিত্র দ্বারা।
অপর এক হাদীসে তিনি বলেন,
ان الله قسم اخلاقكم كما قسم ارزاقكم
আল্লাহ তা’আলা তোমাদের আখলাক বন্টন করেছেন যেমন বন্টন করেছেন তোমাদের জীবনোকরণ।
তিনি পরিপক্ক ঈমান বিশিষ্ট মুমিনের মাপকাঠি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন,
اكمل المؤمنين ايمانا احسنهم خلقا
মুমিনদের মধ্যে ঈমানে পরিপূর্ণ সেই ব্যক্তি, যে তাদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম চরিত্রবান।
অপর এক হাদীসে আছে,
ان من خياركم احسنكم اخلاقا
তোমাদের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট ব্যক্তি সেই যে চরিত্রে সবার সেরা।
এক বর্ণনায় আছে;
ان المؤمن ليدرك بحسن خلقه درجه الصائم القائم
মুমিন ব্যক্তি তার উত্তম চরিত্র দ্বারা সেই ব্যক্তির মর্যাদায় পৌঁছে যায়, যে দিনভর রোজা রাখে, রাতভর সালাতে রত থাকে।
কোন কোন বর্ণনায় আছে, আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভালোবাসা লাভের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট পন্থা আছে উত্তম চরিত্র অবলম্বন করা। এক হাদীসে রাসূল সাল্লাহু আলাই সাল্লাম বলেন,
احب عباد الله الى الله احسنهم اخلاقا
আল্লাহ তাআলার নিকট তার প্রিয়তম বান্দা হচ্ছে সেই ব্যক্তি যার চরিত্র সবচেয়ে ভালো।
অপর এক রেওয়াতে আছে,
ان من احبكم الي واقربكم مني في الاخره نزلي سن احسنهم اخلاقا
তোমাদের মধ্যে আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় এবং আখেরাতে আমার মজলিস সমূহে আমার সবচেয়ে নিকটতম হবে সেই ব্যক্তি, যে সর্বাপেক্ষা উত্তম চরিত্রের অধিকারী।
প্রিয় সুধী! আসুন আমরা নিজের জিন্দেগি সেই অনুপম চরিত্র মাধুরীর আলোকে গড়ে তুলি। তাহলে দূর হতে পারে আজকের এই সার্বিক অবক্ষয়।
সুতরাং আদর্শের পথে এই হোক আমাদের নবযাত্রা। রবিউল আউয়াল সেই পবিত্র অঙ্গীকারের মাস। আদর্শেই প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে আমাদের জীবন। আমিন।

 

1774total visits,4visits today

1 COMMENT